ভালবাসা দিবস ও এক লাবনী

ঘড়ির কাটা চারটা ছুঁই ছুঁই। সূর্য্যটা অনেক আগেই মাথার উপর থেকে সরে পশ্চিম আকাশে মেঘের আড়ালে উকিঁ দিচ্ছে, চলছে রোদ আর ছাঁয়ার পালা বদল । দিনটি ছিল ২০০৮ সনের ১৪ ফেব্রুয়ারী । সামনে গড়াই নদী, পাশে রেণউইক বাঁধ। বাঁধটির পিছনে রয়েছে ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির অসংখ্য গাছ । কোন কোন গাছের নিচে জোরায়-জোরায় যুবক-যুবতি একান্ত আলাপচারিতায় বসে আছে ঘন্টার পর ঘন্টা । সকাল থেকে এখানে প্রেমিক-প্রেমিকাসহ সব ধরনের মানুষের উপস্থিতি অন্যান্য ছুটির দিনের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। বিকেল টাকে বিদায় জানাতে সূর্য্যটা যতই পশ্চিম আকাশে নূয়ে পড়ছে সব বয়সী মানুষের ভীড় ততই বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে রেণউইক বাঁধ যেন পরিণত হয় জনসমুদ্রে। এসময় কিছু উশৃঙ্খল ছেলে দাপিয়ে বেড়াতে থাকে বাধের এ মাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত, আর ভালবাসা-ভালবাসা বলে উচচ স্বরে চিৎকার করতে থাকে। এতে উপস্থিত অনেকে বিরক্ত হলেও কেউ কেউ ওদের কাছে থেকে মজা লুঠতে থাকে । 
গোধুলীলগ্নে সূর্য্যটা যখন মুখ লাল করে পশ্চিম আকাশের হারিয়ে যাচ্ছিল সে মুহুর্তে মানুষের ভীড়ে তিল ধারনের জায়গা ছিল না রেণউইক বাঁধ এলাকায় । পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে ওই সময় কিছু পুলিশ বাঁশি বাজিয়ে সতর্ক করতে থাকে এবং সকলকে সাড়ে ৭ টার পূর্বেই ওই এলাকা থেকে সরে যেতে নির্দেশ দিয়ে প্রচার করতে থাকে । ৭ টা ছুই ছুই এরই মাঝে সূর্য্যটাকে বিদায় জানিয়ে অনেকে ফিরে যেতে শুরু করেছে যে যার গন্তব্যে। কিছু ছবি সংগ্রহ করে আমিও যোগ দিলাম ফিরে যাওয়ার দলে । ফেরার পথেই রেণউইক বাঁধের ঠিক উত্তর পাশে থেকে কেউ যেন করুন সুরে বলে চলেছে স্যার গো একটা ফুল নিন। রজনী গন্ধ্যা-গোলাপ, নিননা একটা ফুল। আনমুনা হয়েই দাঁড়িয়ে গেলাম, কে জানার চেষ্টা ? কিন্তু সূর্য্যটা সন্ধ্যাকে আমন্ত্রন জানিয়ে অনেক আগেই বিদায় নেয়ায় কিছুটা আন্ধকার তখন হাত ছানী দিচ্ছে চারিদিকে । যে কারনে চেহারা টা তেমন বোঝা যাচ্ছিলনা । একটু এগিয়ে দেখার চেষ্টা, দেখা গেল ৮/১০ বছরের এক কিশোরী মুখটি ম্লান করে মিনতির স্বরে বলছেন কথা গুলো। বড় মায়াবী চেহেরা । দলে দলে ফিরে যাওয়া মানুষ গুলো শুনছেন তার কথা আর তাকিয়ে দেখছেন কিন্তু কেউ ফুল কিনছেন না । কেউ ফুল না কেনায় বড় আফসোস করে মিনতির স্বরেই পুরুনো কথাই বলে চলেছে মেয়েটি ।
আরেকটু কিশোরীর কাছে এগুতেই সে আরো আগ্রহ নিয়ে বললো, স্যার ফুল নেবেন নিন না । ফুল বেচা না হলে আমার ছোট বোনটির জন্য খেলনা কেনা হবে, মায়ের জন্য ওষুধ কেনা হবে না, যেন আরো করুন স্বরে জানালো মেয়েটি। বড় মায়াবী চেহারা ওর। কিছু না বলেই মেয়েটির একটি ছবি তুলে নিলাম । করুন চাওনী থেকেই মেয়েটি বললো, আমাগো ছবি দিয়ে কি হয় স্যার ? কোন জবাব না দিয়ে ১০ টাকা কিশোরীর হাতে দিতেই সে বললো নিন স্যার ৫ টা ফুল নিন। ফুল লাগবে না আমার, তোমার ছবি তুললাম তাই টাকা দিলাম। ছবি তুললেন আবার ট্যাকা দিলেন ? একটু থেমে গিয়ে আরো একটু কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার বাসায় আর কে আছে ? মেয়েটি জানালো, কুষ্টিয়া আমলা পাড়ার চরে ৩ বছরের ছোট বোন ও মায়ের সাথে থাকে সে। বাবা রিকসা চালক ২ বছর আগে আরেকটি বিয়ে করে সেই মায়ের কাছেই থাকে এবং তাদের কোন খোঁজ নেয়না । নিরুপায় মা’ এক বাসা বাড়ীতে কাজ করে, বাবা থাকতে সে ব্রাক স্কুলে যেতো কিন্তু বাবা নেই, আর স্কুলে যাওয়া হয়না তার । মা অন্যের বাসা বাড়ীতে কাজ করে তাই ছোট বোনকে নিয়ে ঐ চরের বাসাতেই থাকতে হয় তাকে। ২ দিন হলো মায়ের জ্বর, কাজে যেতে পারিনি, মা বলেছে আজ নাকি ভালবাসার দিন, অনেক ফুল বিক্রি হয়।
সকাল ১০ টার দিকে তাদের এক পরিচিত মানুষের সাথে এসে ৫০ টাকার বাকীতে ফুল নিয়ে শহরের কয়েকটি পার্কে ছাড়াও বেশ কিছু জায়গা ঘুরে সারাদিনে মাত্র ৪৫ টাকা ফুল বিক্রি হয়েছে। কিন্তু ফুলের দোকানের বাকী ৫০ টাকা সে দেবে কোত্থেকে কথাটি বলতে বলতে মেয়েটির চোঁখে পানি এসে যায়। এদিকে সকালে সংগ্রহ করা ফুল সন্ধ্যা হওয়াতে অনেকটা শুকিয়ে গেছে। সারাদিন ঠিকমত নাওয়া খাওয়া না করাতে মেয়েটির মুখটিও শুকিয়ে বেশ মলিন হয়ে গেছে। যে দোকান থেকে বাঁকীতে ফুল নিয়ে এসেছো চিনিয়ে দিতে পারবে ? জিজ্ঞাসা আমার, মাথা নেড়ে হা জানালো মেয়েটি। সাথে নিয়ে নিলাম । 
কুষ্টিয়া শহরের ফুলের দোকান গুলো থানার মোড়েই। রেণউইক বাঁধ থেকে কয়েক মিনিট হাটলেই ফুলের দোকান গুলোর দেখা মিলবে। বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছিল মেয়েটিকে তাই রিক্সা নিয়েই রওনা হলাম। পৌঁছানোর আগেই জিজ্ঞাসা করলাম ওষুধের প্রেসক্রিপশন আছে কি, মেয়েটি মাথা নেড়ে হা জানিয়ে বেড় করে দিলো প্রেসক্রিপশনটি। রিকসা থামিয়ে ওষুধের দোকানে প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে মাত্র কয়েক টাকার জ্বরের ওষুধ । তা কিনে নিলাম। ওষুধের পেকেট টি মেয়েটির দিকে এগিয়ে ধরতেই তার সারাদিনের উপার্জন কয়েকটি টাকা এগিয়ে দিলো আমার দিকে। ইশায়ায় জানালাম লাগবে না, এ সময় হাফছেড়েই যেন ক্লান্তির নিঃশ্বাস নিলো মেয়েটি। ফুলের দোকানের দিকে এগিয়ে চল্লাম আর বললাম দোকান টি কোথায় ? জিজ্ঞাসা করা মাত্রই সে আঙ্গুল উচিয়ে দেখলো দোকানটি ।
ফুলের দোকান মালিক আমার পরিচিত তাই বেশী বোঝানোর প্রয়োজন পরেনি। দোকানের বকেয়া পুরো ৫০ টাকা হাতে দিতেই মাত্র ২০ টাকা আর ফুল গুলো রেখে দেয় । ৩৫ টাকা মেয়েটির হাতে দিয়ে আরও ২ টি গোলাপ মেয়েটির হাতে দিয়ে বললাম একটা তোমার আর এক টা ছোট বোনকে দেবে কেমন ? কথা টা শুনে মুহুর্তের মধ্যে কিশোরীর মলিন মুখটি ফুটে উঠে এক উজ্জ্বল হাঁসিতে। কি নাম জানতে চাইলে বলে আমার নাম লাবনী আবার একটু হাঁসি । ভালবাসা দিবস আসলেই সেই হাসি মুখটি ভেসে উঠে দুচোঁখে ।
ক্লান্ত শরীরে অফিসে ফিরে কিশোরী লাবনী কে নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখার চেষ্টা । সম্পাদক মনজুর এহসান চৌধুরী, মিঠু ভাই বললেন এই প্রতিবেদনটি হবে ‘আন্দোলনের বাজার' পত্রিকার আগামী কালের প্রধান শিরোনাম । মেয়েটির ছবি আছে তো জিজ্ঞাসা সম্পাদকের ? বললাম বস আন্ধকারে ছবিটি অস্পষ্ট হয়েছে। সমস্যা নেই এটাই হবে ছবির নতুন ষ্টাইল। পরের দিন পত্রিকায় “ভালবাসা দিবসে কিশোরী লাবনী” শিরোনামে প্রতিবেদনটি ছপা হলে সকালে ঘুম ভাঙ্গে ভক্ত ও সহকর্মীদের ফোনে, লেখাটির জন্য শুভেচ্ছা জানান অনেকেই। এক এক করে কেটে গেছে অনেক গুলো বছর। ১৪ ফেব্রুয়ারি এই দিনটি এলে বড় মনে পরে সেই কিশোরীর কথা । খুব জানতে ইচ্ছে করে কেমন আছে সেই কিশোরী লাবনী ।

মন্তব্য


আরো নতুন খবর...

ABOUT US

এটি একটি অনলাইন খবরের তথ্য ভান্ডার। যা কুষ্টিয়াকে সমৃদ্ধ করতে তথ্য নির্দেশ করে।

This is a online news portal.
Which contain directory of enriched kushtia.