চালের বাজারে কারসাজিতে কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ীসহ নিয়ন্ত্রণ করছেন দেশের চার-পাঁচ জন বড় ব্যবসায়ী

 । দেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হচ্ছে চালের বাজার। আর তাই সরকার প্রতিনিয়ত চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। যদিও কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় এই পণ্যটি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চালবাজি করে যাচ্ছে। কখনো সরবরাহ ঘাটতি, কখনো মিলাররা অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন, চালের পাইকারি বাজারে মূল্যবৃদ্ধিতে এমন অজুহাত চলছে দিনের পর দিন। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিজেদের ইচ্ছেমতো মুনাফা নিচ্ছেন এসব বড় ব্যবসায়ী। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, দেশের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন চার-পাঁচ জন বড় ব্যবসায়ী। তাই হঠাৎ হঠাৎ চালের দাম বেড়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতেই কম দামে ধান ও চাল কিনে গোডাউন ভর্তি করেন আড়তদার ও মজুদদাররা। পরে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করে ‘লালে লাল’ হচ্ছেন তারা। বিভিন্ন সময়ে অভিযান চললেও থেমে থাকে না এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি। আর এভাবেই কিছুদিন পরপরই বাড়ছে চালের দাম এবং এতে বেকায়দায় পড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। গত শনিবার (৯ মার্চ) রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে চাল সিন্ডিকেটকারীদের কথা স্বীকার করলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। প্রতিযোগিতা কমিশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমরা যখন নতুন সরকার গঠন করলাম তার কয়েক দিনের মধ্যেই হঠাৎ চালের বাজার বেড়ে গেল। তখন আমি খাদ্যমন্ত্রীসহ চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করলাম। তারপর আমরা জানতে পারলাম দেশে মাত্র চার-পাঁচ জন বড় ব্যবসায়ী চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের মধ্যে একটা যোগসাজশ তৈরি হয়। ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ ধরনের যোগসাজশ থাকলেই সাধারণ জনগণ ক্ষতির মুখে পড়ে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর এ কথার তীব্র প্রতিবাদ জানান বগুড়ার শান্তাহারের নাহিদ অ্যারোমেটিক অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী আহম্মেদ আলী সরদার স্বপন। তিনি বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রীর এ কথা আমি কোনোভাবেই বিশ্বাস করি না। কারণ চাল মিল মালিকদের অবস্থা এখন ভালো নেই। বড় ব্যবসায়ীরা বেশি ঋণ পাচ্ছেন। যেমন ৫ কোটি টাকার মিলের মালিক ৫০ কোটি টাকা ঋণ পাচ্ছেন। আবার ২০ লাখ টাকার মিলের মালিক ১০ লাখ টাকা কিংবা ১০ লাখ টাকার মিলের মালিক ঋণ পাচ্ছেন এক লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় ১০-১২ বছর আগে দেশে প্রায় ২০ হাজার চাতালের পাশাপাশি প্রায় ১২শ থেকে ১৫শ অটো রাইস মিল ছিল। কিন্তু চালের সে বাজার এখন কেন্দ্রীভূত হচ্ছে মুষ্টিমেয় কয়েকটি শিল্প গোষ্ঠীর হাতে। সরকার ও ব্যাংক থেকে নানা সুবিধা পেয়ে তারা ফুলে-ফেঁপে উঠছে। বিপরীতে হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন মাঝারি ব্যবসায়ীরা। মুখচেনা সেই কয়েকটি গোষ্ঠীর খেয়াল-খুশিতেই চালের বাজার জিম্মি হয়ে আছে। চালের বাজারে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা সৃষ্টি হয় ২০১৭ সালে। এ সময় প্রতি কেজি চালে প্রায় ১৮-২০ টাকা দাম বেড়ে যায়। অবৈধভাবে চাল মজুদকারীদের গ্রেপ্তারে সারা দেশে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চালের গুদামে অতিরিক্ত মজুদের অভিযোগে বাংলাদেশ রাইস মিল এসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলীকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়া হয়। অটো রাইস মিলের মালিক আবদুর রশিদের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। ‘মিনিকেট রশিদ’ নামেও পরিচিত তিনি। কুষ্টিয়া ও নওগাঁয় তার চালের মিল ও গুদাম আছে। লায়েক আলীর বাড়ি জয়পুরহাটে। ৪০ টন সক্ষমতার হাসকিং মিল ‘মদিনা চালকল’ রয়েছে তার। তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এক অনুষ্ঠানে বলেন, রশিদ বিএনপির অর্থ জোগানদাতা। লায়েক আলী জামায়াতের রাজনীতি করেন। তারাই ষড়যন্ত্র করে চালের বাজার অস্থির করেছেন। এ ছাড়া কুষ্টিয়ায় সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা অনুসন্ধান চালায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলায় ৫০০ মিলের মধ্যে ৭০টি মিলে চালের অস্বাভাবিক মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ৫০টি হাস্কিং এবং ২০টি অটোমেটিক রাইস মিলও রয়েছে। আর মজুদের শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে রশিদ অ্যাগ্রো ফুড, বিশ্বাস অ্যাগ্রো ফুড, দাদা রাইস মিল, স্বর্ণা রাইস মিল, ব্যাপারী এবং থ্রি স্টার রাইস মিল। তবে সে সময় আপাতত বাজার স্থিতিশীল হয়ে আসায় সরকারের সে হুঁশিয়ারি আর এগোয়নি। বরং সেসব ব্যবসায়ীই হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ধান মজুদ করে সিন্ডিকেশন করছে বলে এখনো অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এ কে এম খোরশেদ আলম খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, মুখচেনা কয়েকটি শিল্পগ্রুপ এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, এ বছর আমি ব্যাংকঋণ পেয়েছি ৫০ লাখ টাকা, যা তিন দিন ধান কিনলেই শেষ হয়ে যাবে। অথচ কুষ্টিয়ার রশিদ রাইস মিল দেড় হাজার কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। তারা সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও ইএফ ফান্ডের টাকা পেয়েছে।

মন্তব্য


আরো নতুন খবর...

ABOUT US

এটি একটি অনলাইন খবরের তথ্য ভান্ডার। যা কুষ্টিয়াকে সমৃদ্ধ করতে তথ্য নির্দেশ করে।

This is a online news portal.
Which contain directory of enriched kushtia.